Opinion

বাংলাদেশে সমকামীদের অধিকার: ৩৭৭ ধারা, রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামি এবং বাঁচার অপরাধ

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন | ২৩ জুন ২০২৩

বাংলাদেশে সমকামী হওয়া কোনো “নৈতিক বিচ্যুতি” নয়—এটি একটি মানবিক বাস্তবতা। তবু এই দেশে সমকামী হওয়া আজও কার্যত একটি অপরাধের মতোই দেখা হয়। কেন? কারণ রাষ্ট্র এখনো দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে বুক ফুলিয়ে বহন করে—একটি ঔপনিবেশিক আইন, যা মানুষের প্রেম, পরিচয় ও শরীরকে অপরাধ বানায়। এই ধারার অস্তিত্বই প্রমাণ করে রাষ্ট্র এখনো নাগরিকদের সমান মানুষ হিসেবে দেখতে প্রস্তুত নয়।

৩৭৭ ধারা কী বলে? এটি “প্রকৃতির বিরুদ্ধে যৌন আচরণ”-কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে—একটি অস্পষ্ট, অমানবিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন সংজ্ঞা। এই আইন ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে এসেছে, কিন্তু স্বাধীনতার পর সাত দশকেও বাংলাদেশ এটি বাতিল করতে পারেনি। ভারত ২০১৮ সালে এই আইন বাতিল করেছে। নেপাল বহু আগেই সমকামীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ? এখানে রাষ্ট্র এখনো ভয় পায়—কাকে? মৌলবাদী চাপে।

এই ভয়ই সমকামী নাগরিকদের সবচেয়ে বড় শত্রু। ৩৭৭ ধারা থাকলেই পুলিশ, সমাজ, পরিবার—সবাই একটি অস্ত্র পেয়ে যায়। এই ধারা প্রয়োগ করা হোক বা না হোক, এর অস্তিত্বই ভয়, ব্ল্যাকমেইল ও নিপীড়নের লাইসেন্স। চাকরি হারানো, পরিবার থেকে বিতাড়ন, সামাজিক একঘরে করা—সবকিছুর পেছনে এই আইন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।

এই রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামির সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ড। ২০১৬ সালে ঢাকায় আল-কায়েদা-ঘেঁষা উগ্রবাদীরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে বাংলাদেশের প্রথম LGBTQ+ ম্যাগাজিন “রূপবান”-এর সম্পাদক জুলহাজ মান্নানকে। টনয়কেও হত্যা করা হয়। তাদের অপরাধ কী ছিল? তারা দৃশ্যমান হতে চেয়েছিল। তারা মানুষ হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিল।

এই হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্র কী করল? কয়েকটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, কিছু গ্রেপ্তার—কিন্তু ৩৭৭ ধারা বাতিল করল না। রাষ্ট্র আসলে কী বার্তা দিল? “আমরা তোমাদের মারাকে খারাপ বলি, কিন্তু তোমাদের অস্তিত্বকে বৈধ বলি না।” এই দ্বিচারিতাই উগ্রবাদকে সাহস দেয়। কারণ উগ্রবাদ জানে—রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সমকামীদের পাশে দাঁড়াবে না।

এখানেই সমকামী অধিকার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এক বিন্দুতে মিলিত হয়। অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রী চ্যাটার্জি (নীলয়)—এই ব্লগারদের হত্যা কেবল ধর্মীয় উগ্রতার ফল ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফল। কারণ রাষ্ট্র স্পষ্ট করে বলেনি—ভিন্ন মত, ভিন্ন পরিচয় অপরাধ নয়। উল্টো রাষ্ট্র বলেছে—“সংবেদনশীলতা মেনে চলুন।”

সংবেদনশীলতা কার? যারা খুন করে তাদের? নাকি যারা বাঁচতে চায় তাদের?

৩৭৭ ধারা বাতিল না রেখে রাষ্ট্র কার্যত ঘোষণা দেয়—সমকামী নাগরিকরা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। এই ঘোষণা শুধু আইনেই নয়, সমাজেও প্রতিফলিত হয়। পরিবার বলে—“আইনেই তো অপরাধ।” শিক্ষক বলে—“সমাজ মানে না।” পুলিশ বলে—“আইন আছে।” এই চক্র ভাঙার একমাত্র উপায়—আইন বদলানো।

সমকামী অধিকার মানে “বিশেষ অধিকার” নয়। এটি সমান অধিকার—বাঁচার অধিকার, কাজ করার অধিকার, ভয় ছাড়া ভালোবাসার অধিকার। ৩৭৭ ধারা যতদিন থাকবে, বাংলাদেশ ততদিন নিজেকে মানবাধিকার রাষ্ট্র বলতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *