মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন | ১২ জানুয়ারী ২০২৪
বাংলাদেশে উগ্র ইসলামিস্টদের উত্থান কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, নীতিগত আপস, বিচারহীনতা এবং সমাজের ভেতরে ক্রমশ বাড়তে থাকা ভয়ের ফল। যারা আজও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে “ধর্মীয় আবেগ”, “সংবেদনশীলতা” বা “সংলাপ”-এর বুলি আওড়ায়, তারা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যে বলছে, না হয় বাস্তবতা বোঝার যোগ্যতা হারিয়েছে। উগ্র ইসলামবাদ এখানে কোনো ধর্মচর্চা নয়—এটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, যার লক্ষ্য রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে একটি সংকীর্ণ আদর্শিক ছাঁচে বন্দি করা।
এই উত্থানের প্রথম ধাপ ছিল ভাষা দখল। কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না—এই সীমারেখা টেনে দেওয়া হলো। লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী—সবাইকে বোঝানো হলো, “এই বিষয়গুলোতে কথা বললে সমস্যা হবে।” রাষ্ট্র তখন কী করল? কিছুই না। রাষ্ট্র নীরব থাকল। এই নীরবতা ছিল উগ্রবাদীদের সবচেয়ে বড় বিজয়। কারণ উগ্রবাদ শক্তিশালী হয় তখনই, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তী ধাপে এলো নৈতিক পুলিশিং। নারীর পোশাক, চলাফেরা, কাজ করা—সবকিছু প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু হলো। সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বকে সন্দেহের চোখে দেখা হলো। LGBTQ+ জনগোষ্ঠীকে সরাসরি অমানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। এই ঘৃণার ভাষা ওয়াজ-মাহফিল, অনলাইন ভিডিও, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। অথচ রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল, অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থক। কখনো বলা হলো “দুই পক্ষকে সংযম দেখাতে হবে।” এই “দুই পক্ষ” কারা? যারা হুমকি দেয় আর যারা বাঁচতে চায়—তাদের কি এক কাতারে ফেলা যায়? এই নৈতিক ভণ্ডামিই উগ্রবাদকে সামাজিক বৈধতা দিয়েছে।
বাংলাদেশে উগ্র ইসলামিস্টদের উত্থানের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি সহিংসতা ছাড়াই সমাজ দখল করছে। মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-censorship) এখন স্বাভাবিক আচরণ। শিক্ষক ক্লাসে কিছু বিষয় এড়িয়ে যান। সাংবাদিক কিছু শব্দ ব্যবহার করেন না। শিল্পী কিছু বিষয় আঁকেন না। এই ভয়ই উগ্রবাদীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রাষ্ট্র যখন এই ভয় ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্র কার্যত আত্মসমর্পণ করে।
এই উত্থানের পেছনে বিচারহীনতার ভূমিকা অপরিসীম। হুমকি, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সামাজিক নিপীড়নের ঘটনায় শাস্তি না হলে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়—এই অপরাধগুলো “চলবে”। উগ্রবাদীরা তখন আরও সাহসী হয়। তারা জানে, রাষ্ট্র দ্বিধাগ্রস্ত। আইন প্রয়োগ হবে না, বা হলেও দেরিতে, বা দুর্বলভাবে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি উগ্রবাদকে শুধু শক্তিশালীই করে না; এটি সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়।
আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো তরুণদের টার্গেট করা। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভাব, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা—এই শূন্যতায় উগ্রবাদ সহজ উত্তর দেয়। তারা বলে—তোমার কষ্টের কারণ আধুনিকতা, নারীর স্বাধীনতা, ভিন্ন পরিচয়। এই সরলীকরণ তরুণদের কাছে আকর্ষণীয়, কারণ রাষ্ট্র তাদের জটিল সমস্যার কোনো বিশ্বাসযোগ্য সমাধান দিতে পারেনি। রাষ্ট্র যখন তরুণদের জন্য আশা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন উগ্রবাদ তাদের দখল করে।
সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো—এই উত্থানকে অনেকে এখনো “সমাজের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া” বলে চালাতে চায়। না, এটি স্বাভাবিক নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফল। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস; কিন্তু ধর্মের নামে রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এই সত্য স্বীকার না করলে বাংলাদেশ একটি ভয়ভিত্তিক, নীরব, দমবন্ধ করা সমাজে পরিণত হবে—যেখানে আইন নয়, গোষ্ঠীর ইচ্ছাই শেষ কথা।
