মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন | ২১ ডিসেম্বর ২০২৩
বাংলাদেশে সমকামী নাগরিকদের প্রশ্নটি আজ আর শুধু অধিকার প্রশ্ন নয় এটি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা ভেঙে পড়ে। জুলহাজ মান্নান হত্যার পর থেকে সমকামী নাগরিকরা বুঝে গেছে দৃশ্যমান হওয়া মানে ঝুঁকি।
এই ঝুঁকির পেছনে আছে তিনটি শক্তি: ৩৭৭ ধারা, মৌলবাদী সহিংসতা, এবং রাষ্ট্রীয় নীরবতা। এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করে সমকামীদের জীবনকে অদৃশ্য কারাগারে বন্দি করেছে। তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে পারে না, সংগঠিত হতে পারে না, এমনকি শোকও প্রকাশ করতে ভয় পায়।
রাষ্ট্র প্রায়ই বলে “আমরা সহিংসতা সমর্থন করি না।” কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনি কি সেই আইন বাতিল করছেন, যা সহিংসতার নৈতিক ভিত্তি জোগায়? উত্তর না। তাহলে আপনার বক্তব্য ফাঁকা।
জুলহাজ মান্নান ছিলেন কেবল একজন অ্যাক্টিভিস্ট নন; তিনি জাতিসংঘে কাজ করেছেন, তিনি সংস্কৃতির মানুষ ছিলেন। তাকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে। তবু রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল সীমিত। কোনো জাতীয় শোক নেই, কোনো নীতিগত পরিবর্তন নেই। এই নীরবতাই উগ্রবাদীদের বলে “এটা করা যায়।”
ব্লগার হত্যাগুলোও একই বার্তা দিয়েছে। মতপ্রকাশ, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ সবকিছু মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট: যারা ভিন্ন, তারা নিরাপদ নয়। সমকামী নাগরিকরা এই তালিকার শীর্ষে কারণ তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনই দাঁড়িয়ে আছে।
৩৭৭ ধারা বাতিল মানে উগ্রবাদকে বার্তা দেওয়া “তোমরা ঠিক নও।” এই বার্তা দেওয়ার সাহস রাষ্ট্র দেখাতে পারেনি। কারণ রাজনৈতিক সুবিধাবাদ। ভোট, রাস্তাঘাট, “অসন্তোষ” এই সব অজুহাতে মানবাধিকার বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।
অনেকে বলে “বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়।” প্রশ্ন হলো মানুষ মরার পর কি রাষ্ট্র প্রস্তুত হয়? ভারত প্রস্তুত ছিল? না। প্রস্তুত করেছে আদালত ও নাগরিক সমাজ। প্রস্তুতি কোনো স্বাভাবিক অবস্থা নয়; এটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল।
সমকামী অধিকার মানে ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন। সংবিধান সমতার কথা বলে। ৩৭৭ ধারা সেই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যতদিন এই সাংঘর্ষিক আইন থাকবে, ততদিন বাংলাদেশ নিজেকে ন্যায়বিচারের দেশ বলতে পারবে না।
এই লেখার শেষ কথা সোজা:
৩৭৭ ধারা বাতিল না করা মানে রাষ্ট্র নিজেই সহিংসতার নৈতিক দায় বহন করা।
জুলহাজ মান্নান ও ব্লগারদের রক্ত শুধু উগ্রবাদীদের হাতে নয় রাষ্ট্রীয় নীরবতার হাতেও লেগে আছে।

