রাজীব সাহা | ১৭ ডেসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশে গে ও লেসবিয়ান মানুষদের বাস্তবতা নিয়ে যত কম কথা বলা হয়, বাস্তবে সমস্যাটা ততটাই গভীর। এই নীরবতা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়; এটি ভয়, সামাজিক চাপ এবং কাঠামোগত বৈষম্যের ফল। একজন মানুষ তার পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারবে কি না—এই প্রশ্ন যদি এখনও ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের একটি বড় ব্যর্থতা।
এই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে ঔপনিবেশিক যুগের আইন—দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা। এই আইন শুধু একটি আইনি বিধান নয়; এটি একটি প্রতীক, যা আজও একটি গোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে রাখে। বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ যতই কম হোক না কেন, এর অস্তিত্বই একটি ভয় সৃষ্টি করে। একজন গে বা লেসবিয়ান ব্যক্তি জানেন, আইন তাদের পক্ষে নেই; বরং প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ভয়ই তাদেরকে নীরব থাকতে বাধ্য করে।
৩৭৭ ধারার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে অপরাধের আওতায় নিয়ে আসে। দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই আইন শুধু আইনি ঝুঁকি তৈরি করে না; এটি সামাজিক বৈষম্যকেও বৈধতা দেয়। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আইন এই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না, তাই এটি সমাজেও গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে আইন ও সমাজ একে অপরকে শক্তিশালী করে একটি বঞ্চনার চক্র তৈরি করে।
এই আইনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে ব্যক্তিগত জীবনে। অনেক গে ও লেসবিয়ান ব্যক্তি বাধ্য হন দ্বৈত জীবন যাপন করতে। বাইরে তারা সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করেন, কিন্তু ভেতরে তারা নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখেন। এই দ্বৈততা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মসম্মানবোধের ক্ষতির কারণ হয়।
পরিবারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। যখন একজন ব্যক্তি তার পরিচয় প্রকাশ করতে চান, তখন পরিবার সেটিকে মেনে নিতে না পেরে চাপ সৃষ্টি করে। অনেককে জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়, যেন “সমস্যা”টি মিটে যায়। কিন্তু বাস্তবে এটি সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে এবং আরও মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সামাজিক বাস্তবতাও খুব কঠোর। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানি, বন্ধুত্বের সম্পর্কেও অবিশ্বাস—এসবই তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অনেকেই চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিক অপমান বা শারীরিক নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নিরাপত্তার প্রশ্ন। গত এক দশকে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে যে, ভিন্ন মত বা পরিচয়ের মানুষদের ওপর সহিংসতা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—সহনশীলতার ঘাটতি শুধু মতভেদেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি কখনো কখনো সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। এই বাস্তবতা অনেক মানুষকে আরও ভীত করে তোলে এবং তাদেরকে আরও নীরব করে দেয়।
এই অবস্থায় রাষ্ট্রের দায় এড়ানো যায় না। একটি রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, অথবা আইনের মাধ্যমে বৈষম্য বজায় রাখে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ৩৭৭ ধারা বহাল রাখা মানে শুধু একটি পুরনো আইন ধরে রাখা নয়; এটি একটি বার্তা দেওয়া যে, কিছু মানুষের অধিকার এখনো সম্পূর্ণ স্বীকৃত নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—মানবাধিকার কি নির্বাচিতভাবে প্রযোজ্য হবে? যদি সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে, তাহলে কেন যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে সেই অধিকার সীমিত হবে? এই দ্বৈততা দূর করা প্রয়োজন, অন্যথায় আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।
তবে এই আলোচনায় সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। একটি সমাজে পরিবর্তন আনতে হলে তা সংঘাতের মাধ্যমে নয়, সংলাপের মাধ্যমে করতে হয়। কিন্তু সংলাপ তখনই সম্ভব, যখন একটি পক্ষকে সম্পূর্ণভাবে নীরব করে রাখা হয় না। বর্তমানে অনেক গে ও লেসবিয়ান মানুষের জন্য সেই সংলাপের জায়গাটিই অনুপস্থিত।
শিক্ষা এবং সচেতনতা এই পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে যে ভয় এবং ভুল ধারণা রয়েছে, তা দূর করতে হলে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই কাজটি সহজ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তারা বিশ্বব্যাপী আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন মতকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত দেয়।
সবশেষে, বাংলাদেশে গে ও লেসবিয়ানদের অধিকার নিয়ে প্রশ্নটি কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়; এটি একটি মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্ন। একজন মানুষ তার পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারবে কি না—এটি নির্ধারণ করে একটি সমাজ কতটা ন্যায়ভিত্তিক।
৩৭৭ ধারা এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে। এটি শুধু একটি আইন নয়; এটি একটি বাস্তবতার প্রতিফলন, যা পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে। এই পরিবর্তন একদিনে আসবে না, কিন্তু তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।
সময়ের দাবি স্পষ্ট—নীরবতা ভাঙতে হবে, প্রশ্ন তুলতে হবে, এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে কেউ তার পরিচয়ের কারণে ভয় পাবে না। একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।



