এম ডি সামিউল আলম | ১২ অগাস্ট ২০২৫
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে মৌলবাদী শক্তিগুলোর উত্থান একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সংখ্যালঘু অধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে, যা দেশের সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মতো সংগঠনগুলোর রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২,২৪৪টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের লক্ষ্য করে। এর মধ্যে মাত্র আগস্টের প্রথম ১৬ দিনে ২,০১০টিরও বেশি আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এই আক্রমণগুলো মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যক্তিগত নির্যাতনের রূপ নিয়েছে, যা মৌলবাদী উগ্রতার একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে।
এই উত্থানের পটভূমি বোঝার জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে সামরিক শাসকদের আমলে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের শাসনকালে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়, যা মৌলবাদী গ্রুপগুলোকে শক্তি যোগায়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে এই গ্রুপগুলোকে দমন করা হলেও, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা পুনরায় উত্থান ঘটিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য উগ্র গ্রুপগুলো রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে। এর ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ বেড়েছে, যা প্রায়শই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ধর্মীয় উগ্রতার মিশ্রণে ঘটছে।
হিন্দু নির্যাতনের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম কয়েক সপ্তাহে ২,০০০-এর বেশি আক্রমণ ঘটেছে, যার মধ্যে ৬৯টি মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৫৭টি পরিবারের বাড়িঘর লুটপাট বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। এই আক্রমণগুলো খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা এবং অন্যান্য জেলায় বেশি ঘটেছে। পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে আরও ২৫৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে মন্দির ভাঙচুর এবং ধর্মীয় প্রতীক ধ্বংসের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতো সংগঠনগুলোর রিপোর্টে এই সংখ্যা কিছুটা কম দেখানো হলেও, সামগ্রিকভাবে ২,০০০-এর বেশি আক্রমণের কথা স্বীকার করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে অনেকগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সাথে যুক্ত, কিন্তু ধর্মীয় উগ্রতার ছাপ স্পষ্ট।
মৌলবাদের উত্থানের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি এর প্রধান কারণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পুলিশ এবং প্রশাসনের দুর্বলতা মৌলবাদী গ্রুপগুলোকে উত্সাহিত করেছে। হেফাজতে ইসলাম এবং জামায়াতের মতো সংগঠনগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়েছে, এবং তাদের প্রভাব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মাদ্রাসা-ভিত্তিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে উগ্র মতাদর্শের প্রসার ঘটছে। এছাড়া, সামাজিক মাধ্যমে মিসইনফরমেশন ছড়ানো এবং ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করা এই উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে। ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মহিলারা ঐতিহ্যবাহী চিহ্ন (যেমন শাখা-সিঁদুর) পরতে ভয় পাচ্ছেন, এবং অনেকে নিরাপত্তার অভাবে দেশ ত্যাগের কথা ভাবছেন।
এই নির্যাতনের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব অপরিসীম। হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮% হলেও, তারা অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আক্রমণের ফলে অনেকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, ব্যবসা বন্ধ হয়েছে এবং সম্পত্তি হারিয়েছেন। এটি দেশের সামাজিক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করছে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো যেমন ইউএসসিআইআরএফ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই অবনতিকে নথিভুক্ত করেছে এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে সমালোচনা করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কিছু গ্রেফতার এবং মামলা দায়ের করেছে, কিন্তু অনেকে মনে করেন যে এটি যথেষ্ট নয়। মৌলবাদী গ্রুপগুলোর প্রভাব কমানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপের অভাব দেশকে আরও অস্থির করে তুলছে। এই পরিস্থিতি বন্ধ না হলে বাংলাদেশের সেক্যুলার চরিত্র এবং বহুত্ববাদী সমাজ চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উপসংহারে বলা যায়, মৌলবাদের ছায়া বাংলাদেশকে গ্রাস করছে, এবং হিন্দু নির্যাতন এর সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ। ২,০০০-এর বেশি আক্রমণের এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি জাতির সহিষ্ণুতা এবং মানবাধিকারের সংকট। সরকার, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করে এই উগ্রতাকে দমন করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ পুনরায় শান্তি এবং সম্প্রীতির পথে ফিরে আসতে পারে। এই সংকট অব্যাহত রাখলে দেশের ভবিষ্যত অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

