Opinion

উগ্র ইসলামবাদ ও বাংলাদেশ: নীরবতার রাজনীতি, ভয়ের সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন | ১৮ মার্চ ২০২৩

বাংলাদেশে উগ্র ইসলামবাদ আজ আর প্রান্তিক কোনো শক্তি নয়। এটি মূলধারায় ঢুকে পড়েছে—এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা। এই ঢুকে পড়া ঘটেছে রাষ্ট্রের নীরবতা, প্রশাসনিক দ্ব্যর্থকতা এবং সমাজের ভেতরে জমে থাকা ভয়ের কারণে। যারা আজও বলে “সব ঠিক হয়ে যাবে”, তারা ইতিহাস পড়েনি—অথবা পড়েও ভুলে গেছে। ইতিহাস বলে, উগ্রবাদ কখনো নিজে নিজে কমে না; তাকে থামাতে হয়।

এই উগ্রবাদ প্রথমে আইন ভাঙে না। প্রথমে সে সমাজের নৈতিক মানদণ্ড দখল করে। কী নৈতিক, কী অনৈতিক—এই সংজ্ঞা নিজের মতো করে তৈরি করে। তারপর সেই সংজ্ঞা চাপিয়ে দেয়। রাষ্ট্র যখন এই চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, তখন রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল রাষ্ট্রে উগ্রবাদ ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে ঘটেছে। প্রথমে “সংবেদনশীলতা”-র অজুহাতে কঠোর অবস্থান এড়ানো হয়েছে। তারপর “স্থিতিশীলতা”-র নামে আইন প্রয়োগ শিথিল করা হয়েছে। এরপর “সংলাপ”-এর বুলি আওড়ে বাস্তব সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই তিনটি শব্দ—সংবেদনশীলতা, স্থিতিশীলতা, সংলাপ—উগ্রবাদীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কারণ তারা এই ফাঁকে সমাজ দখল করেছে।

উগ্র ইসলামবাদ বাংলাদেশের সংবিধানিক চেতনার সরাসরি বিরোধী। সংবিধান সমান নাগরিকত্বের কথা বলে; উগ্রবাদ বাছাই করা নাগরিকত্ব চায়। সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে; উগ্রবাদ চায় নিয়ন্ত্রিত ভাষা। সংবিধান নারীর সমান অধিকারের কথা বলে; উগ্রবাদ নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ চায়। এই সংঘাতকে যদি রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে স্বীকার না করে, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।

এই উগ্রবাদের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছে নারীরা, সংখ্যালঘু ও LGBTQ+ জনগোষ্ঠী। এরা জানে—রাষ্ট্র তাদের জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে না। এই উপলব্ধিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্রের বৈধতা আসে তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা থেকে। যখন সেই সুরক্ষা বেছে বেছে দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্র আর ন্যায়সঙ্গত থাকে না।

অনেকে প্রশ্ন করে—এত কড়া ভাষা কেন? কারণ ভদ্র ভাষা এখানে ব্যর্থ হয়েছে। বছরের পর বছর ভদ্র ভাষায় বলা হয়েছে—“উগ্রবাদ সমস্যা।” সমস্যাটা কমেনি; বেড়েছে। এখন সত্য বলতে হবে—উগ্র ইসলামবাদ বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করছে। এটি থামাতে না পারলে ভবিষ্যৎ হবে ভয়ংকর। সেখানে উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি—কিছুই টিকবে না।

রাষ্ট্রকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি নাগরিকদের পাশে দাঁড়াবে, নাকি ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করবে? এই সিদ্ধান্ত আর পিছোনো যাবে না। প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি আপস উগ্রবাদকে আরও শক্তিশালী করছে। ইতিহাস ক্ষমা করে না—বিশেষ করে তাদের, যারা ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *